মীযান ডেস্ক: জাতিভিত্তিক জনগণনার রিপোর্ট প্রকাশ করল বিহার সরকার, যা গোটা দেশে প্রথম এবং নজিরবিহীন। এ ধরনের জনগণনার দাবি মানতে নারাজ বর্তমান কেন্দ্র সরকার। এমনকি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মহিলা আসন সংরক্ষণ বিলে ওবিসি কোটার দাবিও। এমতাবস্থায় সোমবার গান্ধীজয়ন্তীতে বিহারের বহুচর্চিত জাতিভিত্তিক গণনার রিপোর্ট প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীকেই পালটা চাপে ফেলে দিলেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার। এই সদ্য প্রকাশিত রিপোর্ট সাফ জানাচ্ছে, বাংলার নিকটতম প্রতিবেশী রাজ্য বিহারে এখন অন্যান্য অনগ্রসর গোষ্ঠী বা ওবিসি-র আওতায় রয়েছেন ৬৩ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ ওই রাজ্যের জনসংখ্যার অর্ধেকের থেকেও অনেক বেশি। মাত্র ১৫.৫২ শতাংশ মানুষ অসংরক্ষিত সাধারণ শ্রেণিভুক্ত বা জেনারেল ক্যাটেগরির। আসন্ন লোকসভা ভোটের আগে এই রিপোর্ট প্রকাশ করায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে জাতীয় রাজনীতিতে। যার জেরে কার্যত বেসামাল নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ব-কার্ডও। তাই রিপোর্ট প্রকাশ হতেই বিজেপি ও বিরোধীদের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর। আসরে নেমে পড়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রীও। মধ্যপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচনের জনসভায় গোয়ালিয়রে এদিন তিনি অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতায় থেকে কোনও উন্নয়নের কাজ না করতে পারেনি বিরোধীরা। তাই গরিব মানুষের জাতিগত আবেগ নিয়ে তারা খেলা করতে চাইছে। বিভাজন তৈরির ব্যাপক চেষ্টা চলছে। যদিও এই জনগণনা রিপোর্টকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার। বিহার সরকারের শরিক দল আরজেডি নেতা লালুপ্রসাদ যাদব ষড়যন্ত্র পাকানোর অভিযোগ তুলে খোঁচা দিয়েছেন বিজেপিকে। ‘যত বেশি জনসংখ্যা, তত বেশি অধিকারে’র কথা ফের মনে করিয়ে দিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও। কেন্দ্র ও বিভিন্ন রাজ্যে সরকারি চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে ওবিসিদের জন্য সর্বোচ্চ সংরক্ষণ ২৭ শতাংশ। সেখানে বিহারের এই পরিসংখ্যান লোকসভা ভোটের মুখে দেশজুড়ে ওবিসিদের জন্য আরও বেশি সংরক্ষণের জোর দাবি তুলবে বলে অনুমান। বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং জমানার মণ্ডল রাজনীতির পালে ফের হাওয়া লাগতে পারে। এই জোড়া সম্ভাবনা ও আশঙ্কায় সিঁদুরে মেঘ দেখছে গেরুয়া শিবির। কারণ, এতে মোদি-অমিত শাহের হিন্দু ভোটব্যাঙ্কে ধাক্কা লাগা স্বাভাবিক। আর সুবিধা পেতে পারে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। উল্লেখ্য, দেশের মধ্যে এই প্রথম বিহারেই জাতিভিত্তিক জনগণনা হল। নীতীশ সরকারের এই অভিনব ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে বিস্তর আইনি জটিলতার মুখেও পড়তে হয়েছে। সেসব বাধা অতিক্রম করে এদিন প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যের মোট ১৩ কোটি ১০ লক্ষ জনসংখ্যার ৬৩ শতাংশই ওবিসি। তার মধ্যে ৩৬ শতাংশ অতি অনগ্রসর বা ইবিসি এবং ২৭.১৩ শতাংশ অনগ্রসর। তালিকায় সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে যাদব সম্প্রদায়, প্রায় ১৪ শতাংশ। ওই জনগোষ্ঠীই মূলত লালুপ্রসাদের দলের জনভিত্তি। নীতীশের কুর্মি সম্প্রদায় ২.৮৬ শতাংশ। রাজ্যের মুখ্যসচিব বিবেক কুমার জানিয়েছেন, রাজ্যে তফসিলি জনগোষ্ঠী ১৯.৬৫ শতাংশ আর তফশিলি উপজাতি ১.৭ শতাংশ। জেনারেল ক্যাটেগরি ১৬ শতাংশ, ভূমিহার ২.৮৬ শতাংশ, ব্রাহ্মণ ৩.৬৬ শতাংশ, ধর্ম অনুসারে বিহারের ৮২ শতাংশ বাসিন্দাই হিন্দু। মুসলিম ১৭.৭০ শতাংশ। অন্যদিকে বিহার সরকারের প্রশংসা করে বহুজন সমাজ পার্টির সর্বোচ্চ নেতা অখিলেশ যাদব দাবি করেছেন, এবার দেশজুড়ে জাতিভিত্তিক জনগণনা করার জন্য। তিনি বলেন, ‘যারা সত্যিকারের অধিকার পেতে চায়, তারা জাতিভিত্তিক জনগণনা করুক। বিজেপি সরকারের উচিত রাজনীতি ছেড়ে দেশব্যাপী জাতিভিত্তিক জনগণনা করা’। অখিলেশ যাদব আরও জোর দিয়ে বলেন যে জাতিভিত্তিক জনগণনা করা দেশের অগ্রগতির জন্য একটি অনুঘটক। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে যখন লোকেরা বিভিন্ন বর্ণ গোষ্ঠীর ভিত্তিতে নিজেদের জনসংখ্যা সম্পর্কে জ্ঞান রাখে, তখন এটি তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
