করোনার টিকা আবিষ্কার করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পেলেন হাঙ্গেরি ও মার্কিন গবেষক

মীযান ডেস্ক:  সারা বিশ্বের গতি কেড়ে নিয়েছিল এক অদৃশ্য ভাইরাস, যার নাম কোভিড। ২০১৯ এর প্রথম থেকে এই  অতিমারির কবলে পড়ে বিশ্ব। এরপর বিশ্ববাসী শুনেছিল লকডাউন, কোয়ারেন্টিন জোন, সোশ্যাল ডিসট্যান্ট ইত্যাদি খটমট শব্দ। এই কোভিড বা করোনা ভাইরাস কেড়ে নিয়েছে বিভিন্ন দেশের অন্তত ৭০ লক্ষ মানুষের জীবন। এই অতিমারী দীর্ঘদিন স্তব্ধ করে দিয়েছিল বিশ্বজুড়ে সবকিছু। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে গিয়েছিল এই মারণরোগের কারণে। তীব্র আতঙ্কে কার্যত গৃহবন্দি হয়ে পড়েছিল দুনিয়া। আর সেই রোগের প্রতিষেধক ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে বিশ্ববাসীকে করোনা থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন, এমনই দুজনকে এবার চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হল। তাঁরা হলেন হাঙ্গেরিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকার পেনসিলভ্যানিয়া ইউনিভার্সিটির বায়োটেকনোলজিস্ট কাতালিন কারিকো এবং তাঁর সতীর্থ গবেষক মার্কিন চিকিৎসা বিজ্ঞানী ড্রিউ উইজম্যান।

নিউক্লিওসাইড বেস পরিবর্তন সংক্রান্ত সেই গবেষণার সুবাদেই কোভিড-১৯’এর মোকাবিলায় আবিষ্কার হয়েছিল এমআরএনএ (মেসেঞ্জার আরএনএ) ভ্যাকসিন। তারই স্বীকৃতিস্বরূপ এবার চিকিৎসাবিজ্ঞানে যৌথভাবে নোবেল (২০২৩) পেয়েছেন দু’জনে।
জৈব রসায়নবিদ কাতালিনের জন্ম হাঙ্গেরিতে, ১৯৫৫ সালে। বর্তমানে তিনি মার্কিন পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পেরেলম্যান স্কুল অফ মেডিসিনের একজন সহযোগী অধ্যাপক। পাশাপাশি হাঙ্গেরির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনাও করছেন। মার্কিন চিকিৎসাবিজ্ঞানী উইজম্যান পেনসিলভ্যানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাকসিন গবেষণার রবার্টস ফ্যামিলি প্রফেসর এবং পেন ইনস্টিটিউট ফর আরএনএ ইনোভেশনের ডিরেক্টর।

পড়ানোর পাশাপাশি এমআরএনএ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন কাতালিনা। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সহকর্মী ছিলেন অধ্যাপক উইজম্যান। ডেনড্রাইটিক কোষ নিয়ে তাঁর রয়েছে দারুণ আগ্রহ। মানব দেহের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই কোষগুলি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে। মজার বিষয় হল, ভ্যাকসিন প্রয়োগ করলে এই কোষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

বিশ্বে প্রথম কো-ভ্যাকসিন তৈরি করেও নোবেল পেলেন না তুর্কি মুসলিম দম্পতি

অন্যদিকে যে খবরে বিশ্ববাসী থমকে গিয়েছে, সেটা হল তুরস্ক বংশোদ্ভূত মুসলিম দম্পতি উগুর শাহিন এবং ওজলেম তুরেসি সর্বপ্রথম কো-ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেও এবার তাঁরা চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পেলেন না, কেন? অথচ তাঁদেরই তৈরি করোনার টিকা বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে ফাইজার ও বায়োনটেকের করোনাভাইরাস টিকার অনুমোদন দিয়েছিল ব্রিটেন। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে প্রথম সফল টিকা উদ্ভাবক এই তুর্কি বংশোদ্ভূত মুসলিম জার্মান দম্পতিকে সে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ও পুরস্কার (ইমপ্রেস থিওফানো প্রাইজ) দিয়েছিল গ্রিস সরকার। 

২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর এই মুসলিম দম্পতির হাতে পুরস্কার তুলে দিয়ে গ্রিসের প্রেসিডেন্ট ক্যাটেরিনা সাকারানাপুলু বলেছিন, ‘প্রখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী দম্পতিকে গ্রীসের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ও প্রাইজ দিতে পেরে আমরা খুবই আনন্দিত। জীবন ও বিজ্ঞানকে তারা এক সাথে ধারণ করে মানুষের কল্যাণে কাজ করছেন। মানবতার সেবায় শাহিন ও তুরেসির অতুলনীয় অবদানের জন্য এই সম্মান দিয়ে আমরা গর্বিত। আমরা তাদের বিশ্বাস, নিষ্ঠা, মেধা, গবেষণা ও অধ্যবসায়কে পুরস্কৃত করেছি।’

এর আগে শাহিন ও তুরেসি দম্পতিকে করোনার টিকা আবিষ্কারের জন্য জার্মানির সর্বোচ্চ সম্মান (অর্ডার অব মেরিট) পুরস্কার দেয়া হয়। জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক ওয়াল্টার স্টেইনমিয়ার তাঁর সরকারি বাসভবনে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তদানীন্তন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মেরকেলও।

২০০৮ সালে শাহিন ও তুরেসি নিজস্ব ফার্মাসিটিক্যাল কোম্পানি বায়ো-এনটেক প্রতিষ্ঠা করেন। জার্মানির এই নামজাদা প্রতিষ্ঠানটি আমেরিকার খাতনামা ওষুধ কোম্পানি ফাইজারের সাথে হাত মিলিয়ে ‘ফাইজার-বায়োনটেক’ নামে করোনার প্রথম টিকা আবিষ্কার করে। শাহিন ও তুরেসি দম্পতির ফাইজার টিকা করোনা প্রতিরোধে ৯০ শতাংশের বেশি কার্যকর। অত্যাধুনিক এমআরএনএ প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে তারা এ টিকা আবিষ্কার করেন।

তুরস্ক থেকে জার্মানিতে ১৯৬০-এর দশকে আসা অভিবাসী পরিবারে শাহিন ও তুরেসি জন্ম নেন। চিকিৎসা বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষে ক্যানসার চিকিৎসা, আণবিক জীববিদ্যা ও টিকা প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণায় একত্রে সফল ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন তারা।

Share :

Stay Connected

Advt.

%d bloggers like this: